পুরো মিশনে মাছ ধরাটা ছিলো ছদ্মবেশ….

কিভাবে  দস্যুমুক্ত হলো সুন্দরবন! এ নিয়ে নিয়মিত পর্ব লিখছেন আত্মসমর্পণের মধ্যস্থতা কারী সাংবাদিক  যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি মোহসিন উল হাকিম।  সাতক্ষীরার খবরের পাঠকদের জন্য তা নিয়মিত তুলে ধরা হবে :  প্রথম দিকের কথা। ২০০৯ সালের পর পর তখন সুন্দরবনের দস্যুদের নিয়ে কেবল কাজ শুরু করেছি। কাজ বলতে ফোনে ফোনে বনদস্যুদের সঙ্গে কথা বলি। আর সোর্স তৈরীর চেষ্টা করছি। পাশাপাশি সুযোগ পেলেই সুন্দরবনে যাওয়া আসা করতে থাকলাম।

সেই আসা যাওয়ার মধ্য দিয়ে কিছু কিছু সোর্স তৈরী হচ্ছিলো। পাশাপাশি বনের ভেতরে যারা মাছ-কাকড়া ধরেন, তাঁদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তখন সুন্দরবনে ঢুকে এসব কাজ করা বেশ কঠিন ছিলো। কারণ, খালের ভেতরে যেসব যায়গায় জেলেরা মাছ ধরে বা থাকে, সেখানে সাধারণ একজন মানুষ বিশেষ করে একজন সাংবাদিক যাবে বা থাকবে তা বন বিভাগের কর্মীরা মেনে নিতেন না।

এর পেছনে কয়েকটি কারণ ছিলো। মূলত আমার নিরাপত্তার কথা ভেবেই তাঁরা বাধা দিতেন। প্রথম কারণটি ছিলো বনদস্যুদের উপস্থিতি। বন বিভাগের কর্মচারীরা বলতেন, কোনো কারণে দস্যুরা আমাকে ধরে ফেললে বা আঘাত করলে তার জবাব তাঁরা দিতে পারবেন না। তাই জোর করে ঢুকতে গেলে আমার সঙ্গে তাঁরাও রওনা দিতেন খালের ভেতরে। অর্থাৎ আমাকে ফিরিয়ে আনার আগ পর্যন্ত তাঁদের শান্তি ছিলো না।

অন্যদিকে সুন্দরবনের ভেতরে বন বিভাগের অফিসগুলো এমন ভাবে বসানো যে তাদের চোখ আড়াল করে ট্রলার নিয়ে বনের ভেতরে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব। এরপরও চেষ্টা করতে থাকলাম।

সুন্দরবনের জেলেরা অবসরে বরষি দিয়ে মাছ ধরে। প্রথম প্রথম খেয়াল করিনি। একদিন দেখি, নৌকায় বসা এক জেলে হঠাৎ ঝট করে হাত টান দিলেন। হাতে সূতা, সেই সূতা গোছাতে গোছাতে উঠে আসলো একটা মাছ। সঙ্গে সঙ্গে আমি এগিয়ে গেলাম। আধার গেঁথে তিনি আমার হাতে সূতাটা ধরিয়ে দিলেন।

স্থানীয় ভাবে এই বরষির নাম হাতসূত বা হাত বরষি। যাই হোক, মাছ ধরার নিয়ম জেনে নিতে নিতেই সূতায় টান পড়লো।দিলাম টান। তারপর সূতা গুটিয়ে তুলতে শুরু করলাম। পানির নিচে কিছু একটা বেশ নড়াচড়া করছিলো। আমি তো উত্তেজনায় শেষ। অবশেষে বরষি উঠালাম। উঠে এলো একটা কাইন মাছ। এক কেজির ওপর হবে সেই মাছের ওজন। মাগুর মাছের মতো দেখতে মাছটি সেবার প্রথম দেখলাম। পাশের জেলে সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত থেকে মাছসহ সূতা কেড়ে নিলেন। কারণ, এই কাইন মাছের কাটার বিষ না কী সাপের বিষের মতোই ভয়ঙ্কর। মাছ ধরার আনন্দে সেদিন থেকে গেলাম বনে। পরবর্তী এক ঘন্টায় সেদিন নানা জাতের অনেকগুলো মাছ ধরেছিলাম সুন্দরবনের ঝাপসি খালে। মাছ ধরার অভ্যাস বা নেশা সেদিন থেকেই শুরু।

এদিকে সুন্দরবনের দস্যুদের মাঝেও আমার নাম পৌঁছে গেছে। সুন্দরবনের ভেতরে ছড়িয়ে গেলো, একজন সাংবাদিক সুন্দরবনে আসে বরষি দিয়ে মাছ ধরতে। বন বিভাগের লোকজনও তখন বেশ আশ্বস্ত এই ভেবে যে আমি বনের গভীরে খালগুলোতে যাই শুধুই মাছ ধরতে, সময় কাটাতে। অর্থাৎ ভালো একটা উছিলা পেলাম বনের ভেতরে যাওয়ার।

মাছ ধরার কথা বলে বনে ঢুকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছি, যদি কোনো দস্যুবাহিনীর সঙ্গে দেখা হয়! কিন্তু দস্যুরা সামনে আসে না। আশে পাশে থাকলেও আমার উপস্থিতি জানতে পারলেই তারা দূরে সরে যায়। কিন্তু এক সময় তাদের কাছেও প্রতিষ্ঠিত হয়, এই সাংবাদিকের আর কোনো বদ মতলব নাই সুন্দরবনে আসার। এভাবেই মাছ ধরার আড়ালে আমি সুন্দরবন মিশন এগিয়ে নেই। অবশ্য এর মধ্যে মাছ ধরার নেশা পুরোপুরি মাথায় জেঁকে বসে। আর সেই নেশাকে পুরোপুরি মাথায় গেঁথে দেন শ্যামনগরের সাংবাদিক বড় ভাই সালাহউদ্দীন বাপ্পী।

এদিকে সুন্দরবনের কাছের খালগুলোতে মাছ কমে যাচ্ছে নানা কারণে। তাই দিনকে দিন দূরের খাল নদীতে ছুটলাম। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরণের মাছ পাওয়া যায়। জোয়ারের শুরুতে এক রকম, মাঝ জোয়ারে এক রকম, আবার শেষ ভাটায় আরেক রকমের মাছ পাওয়া যায় এই বনের খাল-নদীতে। কখনো চলে গেছি রায়মঙ্গল নদীতে, কখনও বেহালার গোঁড়ায়, কখনও মান্দারবাড়িয়ায় আবার কখনও দেবীর মেধে। মালঞ্চ নদীর টাটের মুখে অনেকবার গেছি মাছ ধরতে বাপ্পী ভাই এর সাথে। সাতক্ষীরার দোবেকী অফিসের সামনে থেকে বিশাল এক জাবা মাছ ধরেছিলাম। মান্দারবাড়িয়াতে ধরেছি লাক্ষা মাছ। আর সেদিন দ্বীপচরে ধরলাম পাঙ্গাস। মাঝে মাছে বরষি ছিড়ে নিয়ে যায় মাছ। ধরে নেই সেটা বড় মাছ ছিলো।

দুবলার চরের ফরেস্ট অফিসের সামনেই বঙ্গোপসাগর। সেখানে মাছ ধরতে বসাটা প্রতি মুহুর্তেই রোমাঞ্চকর। আলোর কোলের দক্ষিণে সাগরে বরষি ফেললেও মাছ হয়। তবে এসব জায়গায় স্টিং রে বা শাপলা পাতা মাছ বরষি খেয়ে বসে। বড় বড় কাকড়াও উঠে পড়ে মাঝে মাঝে। আর নীল কমল নদীর মুখে তো বড় মাছের অভাব নাই। তবে সময় করে সেখানে বসা হয়নি আমার।

সুন্দরবনে যেমন জাল দিয়ে মাছ ধরে জেলেরা, তেমনি বরষি দিয়েও তারা মাছ ধরে। তবে সেটা সাধারণ বরষি না। আরেক ধরণের জেলে আছে, তারা কাকড়া ধরে। তাদের মাছ-কাকড়া ধরার কৌশল নিয়ে আরেকদিন লিখব। তবে এই মাছ ধরার কাজটি ভীষণ পরিশ্রমের। অথচ এতো পরিশ্রমের পর মাছের দাম পায় না এই জেলেরা… জেলেরা তাদের ঝরে যাওয়া ঘামের দামটুকুও পায় না। আফসোস… রক্তচোষারা এখানে সাহেব, মহাজন বো কোম্পানি নামে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে..

আমি একবার মাছ ধরছিলাম পশ্চিম সুন্দরবনের কয়লা খালে। আধা ঘন্টার মধ্যে মাছ রাখার বালতি ভরে গেলো বড় বড় ট্যাংড়া মাছে। মজার ছলে এক মাছ ব্যবসায়ীকে বললাম, মাছগুলো বিক্রি করতে চাই। জবাবে তিনি বললেন, কেজি প্রতি এই মাছের দাম সর্বোচ্চ সাত থেকে আট টাকা পাবো। তাও এক কেজি তিনশ গ্রামে এক কেজি ধরবেন, এটাকে বলে কাঁচা কেজি। এই ট্যাংরা মাছ সুন্দরবনে সবচেয়ে সহজলভ্য মাছ। তাই বলে ৭/৮ টাকা কেজি? এই উত্তর ব্যবসায়ীরা দেন না। জেলেরা বলেন, সৃষ্টিকর্তা কপালে যা রেখেছেন, তার বেশী তো পাওয়ার উপায় নাই…

আমাদের মাছ ধরাটা বিনোদন ছাড়া কিছু না। কিন্তু জেলেদের জীবনটা অন্যরকম। সারাদেশের জেলে, সাগরের জেলেদের থেকে সুন্দরবনের জেলেদের জীবন একেবারেই অন্যরকম। চ্যালেঞ্জ আর নিপীড়নে ভরপুর….চলবে..

Please follow and like us:
error0
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

error

Enjoy this blog? Please spread the word :)