ইয়াবা চোরাকারবারীদের অস্ত্র ও সুন্দরবনের অস্ত্রনামা…. ০১

মোহসিন উল হাকিম ঃ বনদস্যুদের কাছে তেমন কিছু নাই। আমাদের শক্তিশালী অস্ত্রের সামনে দস্যুরা দাঁড়াতেই পারবে না, মুহুর্তেই তাদের গুঁড়িয়ে দিতে পারবো…. কথাগুলো বলছিলেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর একজন সাবেক কর্মকর্তা। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু। বনদস্যুদের আত্মসমর্পন করাতে তখন সংশ্লিষ্টরা রাজি হননি, কারণ অস্ত্রশস্ত্রে দুর্বল বনদস্যুদের তারা এমনিতেই ঘায়েল করে ফেলতে পারবেন… আমার দুই বছর ধরে গোছানো কাজ ব্যর্থ হলো। ২০১১-১২ সালের কথা বলছি।

তখন আমি এটিএন নিউজে কাজ করতাম। বনদস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখায় সে সময়ের একজন কর্মকর্তা বেশ গরম কথাও শুনিয়েছিলেন। আর বিভিন্ন মহলে তখন আমার নামে কুৎসা রটানো হচ্ছে পুরোদমে। বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটের সাংবাদিক ভাইদেরও কেউ কেউ খুব মজা করে আমার নামে গল্প করতেন। টাকার হিসেবে তখন সেই গল্প লাখ লাখে সীমাবদ্ধ ছিলো এখনও কেউ কেউ গল্প করেন, গল্পের ডালপালা মেলতে মেলতে তা কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছে গেছে। অবশ্য সামনা সামনি বেশ ভাল সম্পর্ক। গুরু, বস, বড় ভাই ইত্যাদি নামেও ডাকেন।

প্রথম রাজু বাহিনীর অস্ত্রসহ সহ নিউজ করেছিলাম এটিএন নিউজ-এ। সেবারই প্রথম জলদস্যুদের অস্ত্রের ছবি তুলে এনেছিলাম। ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কী ধরণের অস্ত্র তারা ব্যবহার করে।

রাজুর কাছে ছিলো একটা পরিত্যাক্ত এসএমসি, ১১৮৭ বা শর্টগান। পুলিশের হাতে যে শর্টগানগুলো দেখা যায়, সেগুলো। এমন অস্ত্র ছিলো দশটি, দোনলা ও একনলা বন্দুক ছিলো ৩০টিরও বেশী, থ্রি নট থ্রি বন্দুক ছিল দুটি আর ছিলো কয়েকটি পয়েন্ট টুটু বন্দুক। আত্মসমর্পনের আবেদন করলেও সে সময় সরকার পক্ষ রাজি না থাকায় ব্যর্থ হই সে যাত্রায়।

একই সময়ে কথাবার্তা চলছিলো পূর্ব সুন্দরবনের ত্রাশ জুলফু বাহিনীর প্রধান জুলফু ও পশ্চিমের আল আমিন ও মজনু বাহিনীর সঙ্গে। তারা রাজু বাহিনীর আত্মসমর্পন দেখে তারপর অস্ত্র জমা দিতে চেয়েছিলো। আর বড় বাহিনীগুলোর ভবিষ্যৎ দেখে তখন আত্মসমর্পনের কথা চিন্তা করছিলো আলিফ, মান্নান, আলম, কাশেম, গামা, শীর্ষ, শান্ত, জোনাব, আকাশ বাবু বাহিনী। বনের ভেতরের জলদস্যুদের মধ্যে এই আলোচনা তখন তুঙ্গে। কিন্তু সরকার সেই সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো না।

কয়েক মাসের মধ্যে অভিযানে অভিযানে কোণঠাসা হয়ে পড়ে রাজু। টাকা পয়সা গুছিয়ে নিয়ে সে ভারতে চলে যায়। তবে রেখে যায় অস্ত্র-গুলি। দস্যুদলের নেতৃত্বে আসে শহীদুল। কয়েক মাস পর শহীদুলকে বের করে ইলিয়াসকে নেতা বানায় রাজু। বছর খানেক পরে ইলিয়াসও চলে যায় ভারতে। এরপর নোয়া মিয়ার নেতৃত্ব নেয়, জাহাঙ্গীর নতুন দল করে বেরিয়ে যায়। জন্ম নেয় আরও ছোট ছোট বাহিনী। তার মানে রাজু চলে গেলো, শহীদুল বন্দুকযুদ্ধে মারা গেলো, ইলিয়াস চলে গেলো, নোয়া মিয়া আলাদা দল করলো, মাস্টার বাহিনীতে এসে গড়ালো সেই রাজু বাহিনী। অর্থাৎ দলনেতা চলে গেছে, দলের অনেক সদস্য মারা গেছে, দল ভেঙ্গে গেছে, কিন্তু দস্যুদলটি রয়ে গেছে। শুধু অস্ত্রগুলোর ওপর ভিত্তি করেই দস্যুবাহিনীটি দাপটের সঙ্গে চলেছে বছরের পর বছর।

একই ভাবে অনেক দস্যুনেতা বন্দুকযুদ্ধে মারা গেলেও অস্ত্রগুলি থাকায় সেগুলো রয়ে গেছে। অর্থাৎ বনদস্যুতা টিকে ছিলো অস্ত্রগুলোকে কেন্দ্র করে। তাই অস্ত্রগুলো সম্পূর্ণভাবে উঠিয়ে আনাটাই সমাধান মনে হয়েছিলো। সেজন্য বিকল্প পন্থা আত্মসমর্পনের বিকল্প ছিলো না।

অবশ্য বনদস্যুদের অস্ত্র নিয়ে সংশ্লিষ্টদের ধারণা বদলেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। অত্যাধুনিক অস্ত্র না হলেও সেগুলোর বিপক্ষে সুন্দরবনের ভেতরে বন্দুকযুদ্ধ যে সমতলের যুদ্ধ নয়, তা বুঝেছেন তাঁরা। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ অফিসাররা সুন্দরবনকে বুঝে অভিযান চালিয়েছেন। আত্মসমর্পনে সেই চাপই বড় অনুঘটক ছিলো। ২০১৫ সালের শেষে এসে আবারও যখন আত্মসমর্পনের প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখন RAB এর গোয়েন্দা প্রধান লে কর্নেল আজাদ (পরবর্তীতে সিলেটে জঙ্গিদের বোমা বিষ্ফোরণে শহীদ হন) আমাকে ফোন করে বিস্তারিত শোনেন এবং কাজ এগিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেন। এদিকে খুলনা RAB রাজি না থাকায় বরিশাল RAB এর উপ অধিনায়ক মেজর আদনান কবীরকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত কাজ এগিয়ে নিতে থাকি। RAB মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন বিচক্ষণতার সঙ্গে। আত্মসমর্পন করে মাস্টার বাহিনী। তারই ধারাবাহিকতায় ৩২টি দস্যুদল আত্মসমর্পন করে। জমা দেয় ৪৭০টি অস্ত্র ও সাড়ে ২২ হাজার গুলি। প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেন। পুরো কাজটির পিছনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের উৎসাহ, পৃষ্ঠপোষকতায় অবদান ছিল নিরবচ্ছিন্ন।

নানা রকম প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে কাজটি করেছি আমরা। প্রতিটি অস্ত্র গুলি হিসেব করে দস্যুদের কাছে থেকে নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা, একই ভাবে সেগুলো জমা দিয়ে আত্মসমর্পন করেছে দস্যুরা।

সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফে ইয়াবা চোরাকারবারীরা দেখলাম ৩০টি অস্ত্রও জমা দিয়েছে। কথিত হাজার কোটি টাকার মালিকরা এই অদ্ভুত দর্শন অস্ত্রগুলো কী ব্যবহার করতেন? এর উত্তর কী সংশ্লিষ্টরা দিতে পারবেন? আমি সুন্দরবনের দস্যুদের জমা দেওয়া প্রতিটি অস্ত্রের হিসাব দিতে পারবো। ইয়াবা চোরাকারবারীদের আত্মসমর্পনে মধ্যস্ততাকারীরা কী এই ত্রিশটি অস্ত্র ও সাড়ে তিন লাখ ইয়াবার হিসাব দিতে পারবেন? কার কাছে কোন অস্ত্র, কে কয়টি ইয়াবা জমা দিলেন, তার পরিস্কার হিসাব জানা প্রয়োজন। তা না হলে দুর্বল মামলার সুযোগ নিবে ইয়াবা চোরাকারবারীরা। যা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে ইয়াবা চোরাকারবারীদের হেফাজতে রাখার আইনী ব্যাখ্যা নিয়ে। তারচেয়ে বড় কথা, অপরিচ্ছন্নতার সুযোগ নিয়ে এই প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করবে। মধ্যস্ততাকারী হিসেবে আমাদের মতো সাংবাদিকদের ইমেজ সংকটে পড়বে। প্রশ্নবিদ্ধ হবে আমাদের পুলিশ বাহিনী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এবং প্রধানমন্ত্রীর ইমেজ। ইয়াবা চোরাকারবারীরা আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে যখন সাংবাদিকদের হুমকি দেয়, তখন বিষয়টি আমলে নেওয়া প্রয়োজন নয় কী?

সবাইকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের শুভেচ্ছা..

( নোটঃ গল্পের শুরুতে সুন্দরবনের প্রসঙ্গ এনেছি আমার পুরো কাজের ব্যাপ্তি বোঝাতে। হুট করে কোনো কাজ করিনি আমরা। একই কারণে ছয় মাস আগে টেকনাফ থেকে দেওয়া আত্মসমর্পনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। সেই গল্প আরেকদিন বিস্তারিত লিখব। সুন্দরবনের অস্ত্রের বিষয়ে আরও কথা আছে। পরে লিখব)

Please follow and like us:
error0
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

error

Enjoy this blog? Please spread the word :)