শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০
বাড়ি টপ নিউজ ছিন্ন হলো সেই অবিচ্ছেদ্য জুটি

ছিন্ন হলো সেই অবিচ্ছেদ্য জুটি

সাতক্ষীরার খবর ডেস্ক:  প্রতি ঈদে সাংবাদিকদের ক্যামেরার লেন্স থাকতো তাদের ঘিরে। কখন আরিফ-কামরান গলাগলি করেন। একে অন্যকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। সংবাদমাধ্যমগুলোতে সেই ছবি দিয়ে হতো শিরোনাম।

রাজনীতির ময়দানে একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও তারা ভাই বা বন্ধু ‍হিসেবে ছিলেন অবিচ্ছেদ্য জুটি। সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে দেখা হলেও মেতে উঠতেন খোশগল্পে। অনুষ্ঠানের মধ্যমণি থাকতেন তারা। সেই অনবদ্য জুটি ভেঙে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন জনতার প্রিয় নেতা কামরান। মাঠে-ময়েদানে কিংবা নির্বাচনে আর বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের দেখা পাবেন না আরিফুল হক চৌধুরী।

বয়সে ছোট হলেও আরিফুল হককে ভাই আরিফ সম্বোধন করতেন সাবেক মেয়র কামরান। ছোটদের নামের আগে ‘ভাই’, বড়দের নামের পেছনে ভাই সম্বোধন ছিল তার আদবের একটি অংশ। আরিফুল হক চৌধুরীও অগ্রজ কামরানকে বড় ভাই হিসেবে মানতেন, ডাকতেন।

রাজনীতির মাঠের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীনির্বাচনী মাঠে আরিফুল হকের চির প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। নির্বাচনের খাতিরে একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও তা কেবলই ভোটের মাঠে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে কখনোই রাজনীতিকে টানতেন না। সেটা করে দেখিয়েছেন কামরান।

বিগত দুই মেয়াদে আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে মেয়র পদে নির্বাচনে হারলেও নগর ভবন থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে দু’’হাত পেতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন কামরান। প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রতিপক্ষ না ভেবে সহযোগিতার মানবিক গুণাবলী তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সেটা কেবলই অনুভব করতে পারবেন নগর পিতার আসনে অধিষ্ঠিত বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিলেট সিটি করপোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী, বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের নেতৃত্ব গুণাবলীতে নগর ভবনের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাকে আপন করে নিয়েছিলেন। যে কারণে ক্ষমতা থেকে সরে গেলেও সবার সঙ্গে ছিল ব্যক্তিগত সম্পর্ক।

সাংবাদিক দেবাশীষ দেবু তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় তিনি কারাগারে, তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগ। তবু বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিতহলেন কামরান। সেবার তার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন সিলেটের সিনিয়র সাংবাদিক মহিউদ্দিন শীরু। নির্বাচনোত্তর সংবাদ সম্মেলনে মহিউদ্দিন শীরুকে প্রশ্ন করা হলো-জেলে থাকা, এত অভিযোগ থাকা একটি লোককে কেন এতো ভোট দিল মানুষ?

জবাবে শীরু ভাই বলেছিলেন-কামরানকে কেউ কখনো আগে সালাম দিতে পারেনি, তিনিই সবাইকে আগে সালাম দেন। এটা সিলেটবাসী খুব মুল্যায়ন করে। এ ছিল তার এক বিরাট গুণ।’

তার মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের শোক জানানো থেকে অনুমেয় কতটুকু জনপ্রিয় ছিলেন কামরান। সবার চোখে তিনি ছিলেন সিলেটের রাজনৈতিক সম্প্রীতির নায়ক।

সবশেষ নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার সময়সাংবাদিক ইকবাল মাহমুদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন,সিলেটের রাজনৈতিক সম্প্রীতির যে ঐতিহ্য নিয়েআমরা গর্ব করি, তার অন্যতম নির্মাতা বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। এজন্য তাকে দলীয় ফোরামে বহু সমালোচনাওসহ্য করতে হয়েছে। শুধু কি দলীয় নেতা-কর্মী, আমরা মিডিয়াওয়ালারাও কী কম অবিচার করেছি এউদার রাজনীতিবিদের প্রতি? দলীয় সমাবেশে বক্তৃতায় বিরোধীদলকে রাজনৈতিক ভাষায় কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন কামরান। কর্মীরাও উজ্জীবিত তার আগুনঝরা বক্তব্যে। কিন্তু এ উজ্জীবীত সমাবেশ যাতে রাজপথে সহিংসতায় না জড়ায়, সেজন্য পর্দার আড়ালে কামরানের ভূমিকা থাকতো সদা সতর্ক।’

২০১৮ সালে সবশেষ সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছিলেন কামরান। নির্বাচনের আগে নগরীর একটি হোটেলের হলরুমে ইশতেহার ঘোষণাকালে কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি। বলেছিলেন, আমি আমার নেতৃবৃন্দকে সাক্ষী রেখে বলছি, এটাই হয়তো আমার জীবনের শেষ নির্বাচন। আমি হয়তো কখনোই আর আপনাদের সামনে এভাবে ইশতেহার ঘোষণা করতে আসবো না।’

সেদিন রাজনীতিবিদ হিসেবে কামরানের হৃদয়স্পর্শী কথাগুলো অনেকের মনে দাগ কেটেছিল। আবার অনেকে হয়তো ভেবেছিলেন সহানুভূতি আদায়ের খাতিরে এসব কেবল কথার ফুলঝুরি। কিন্তু কামরানের এই কথাটি সত্যি হয়ে উঠলো। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জীবনের শেষ ইশতেহার দিয়েছিলেন জনগণের কামরান।

সোমবার ভোর থেকে সিলেটের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছেন। তার চেয়ে বেশি উপলব্ধি সেই মানুষটির যিনি নির্বাচনে তাকে হারিয়েছেন। সেই আরিফুল হক চৌধুরী।

সোমবার (১৫ জুন) ভোররাত পৌনে ৩টায় করোনা আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তার মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে রাতজাগা মানুষের আর্তনাদে ভার হয়ে ওঠে ফেসবুক, টুইটার। এসব হয়েছে কেবল তার জনপ্রিয়তায়।

২০১৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে হেরে যান বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। সোমবার কামরানের মৃত্যু সংবাদ শোনার পর তার বাসায় গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মেয়র আরিফ।

আরিফুল হক চৌধুরী নিজের কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, আমরা সিলেটবাসী এই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমরা তাকে চিকিৎসার জন্য বিদায় দিয়েছিলাম, জীবন থেকে নয়। তার এই অসময়ে চলে যাওয়া সিলেটবাসীর জন্য অপূরণীয়ক্ষতি হয়ে গেলো।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular

আহবায়ক কমিটিতেই ৬ বছর পার সাতক্ষীরা জেলা যুবলীগের

আহসানুর রহমান রাজীব: তিন মাসের জন্য গঠিত সাতক্ষীরা জেলা যুবলীগের আহবায়ক কমিটি ৬ বছর পার করেছে। দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় জেলা যুবলীগের...

জেলা ছাত্রলীগের কমিটি না থাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থবির

নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে ৮ মাসেরও বেশি সময় আগে। এরপর থেকে যোগ্য নেতৃত্বের অভাব ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে...

কলারোয়ায় চৌকিদারের পিটুনিতে একজনের মৃত্যু

কলারোয়া প্রতিনিধি : কলারোয়ায় চৌকিদারের পিটুনিতে মারাত্মক আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। নিহত ব্যক্তি কলারোয়া উপজেলার হিজলদী এলাকার জোহর আলীর পুত্র...

সুন্দরবনে মাছের পাশ বন্ধ : অনাহারে কাটছে জেলেদের জীবন

নিজস্ব প্রতিনিধি : সুন্দরবনে মাছের পাশ পারমিট বন্ধ হওয়ায় মানবেতর জীবন যাপন করছে সুন্দরবন উপক‚লের হাজার হাজার জেলে পরিবার। যাদের নুন আনতে পানতা ফুরায়...

Recent Comments