জীবন সেখানে যেমন… ০১ ভাসমান ঘুম… কতো রাত দাঁড়িয়েই কাটিয়েছি…

মোহসিন উল হাকিম: প্রথম বনদস্যু রাজু বাহিনীর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম ২০১১ সালে। খুলনার রূপসা ঘাট থেকে রাত এগারোটার দিকে রওনা দিলাম আমরা। সেবার রাজুর বিশ্বস্ত এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে রওনা হয়েছিলাম। ঘন্টা খানেক ট্রলার চলার পর সেই ট্রলারেই দিলাম ঘুম। এক ঘুমে রাত শেষ। আলো ফুটতেই পৌঁছে যাই গন্তব্যে। অবশ্য তার পরের কোনো সফরে আমার আর ঘুম হয়নি এমন রাতগুলোতে।

বনের ভেতরের নদী খাল ধরে চলেছি ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন। ঠিক দিনের পর দিন না বলে রাতের পর রাত বলাই ভালো। কারণ, শুরু থেকেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার জন্য রাতকেই বেছে নিতাম আমি।

চলাফেরার সময় নিজেদের আড়াল করাই ছিলো বড় চ্যালেঞ্জ। বড় নদী বা সাগরে রাতের অন্ধকারই চলাফেরার জন্য নিরাপদ।

সকালে ঢাকা থেকে রওনা দিলেও সুন্দরবনে ঢুকি গভীর রাতে। আগে থেকেই ট্রলার ঠিক করে রাখি। পথে কোথাও থেকে বাজার সদা করে সোজা ট্রলারে। রান্নাবান্না করে রাতের খাবার তৈরি হতে সময় লাগে। সময়টুকু তাই রান্না আর খাওয়া দাওয়ার কাজে লাগাই।

রাতের ভাটা পর্যন্ত অপেক্ষা করি। সেটা রাত এগারোটাও হতে পারে, হতে পারেরে রাত তিনটাও।

ভাটা শুরু হতেই ট্রলার চলতে শুরু করে। গল্প করতে করতে সবাই যার যার মতো ঘুমিয়ে পড়ে। শুধু ঘুম হয় না আমার। আর ঘুম হয় না ট্রলারের পাইলট বেলায়েত সরদারের।

কোনো দস্যুবাহিনীর কাছে যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট পথেই যেতে হবে। কোস্টগার্ড বা বন বিভাগের সামনে পড়া যাবে না। বড় নদী থেকে ছোট নদী বা খালে প্রবেশের সময় যাতে কেউ না দেখে, সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে অপেক্ষা করবো আমরা, অথবা ছোট খালে চলার পথে টর্চ এর ইশারা বিনিময়, তারপরই হয়েছি দস্যুদের মুখোমুখি।

দস্যুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর কি তাহলে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ ছিলো? সেই সুযোগ অন্যরা পালাক্রমে পেলেও আমার ছিলো না। দিনভর কথাবার্তা, তারপর রাত, রাত পেরিয়ে আবার দিন। একের পর এক চা। শরীরটা ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু দুই চোখ এক করার সুযোগ নাই। বিছানায় পিঠ ঠেকানোরও উপায় নাই। অবশ্য দস্যুদের বিদায় দিয়ে ফেরত আসার সময় ট্রলারের এক কোণায় শুয়ে পড়তাম দুই/এক ঘন্টার জন্য।

ওদিকে লম্বা লম্বা ঘুম দেন আমার সহযাত্রীরা। সুন্দরবনের উৎকন্ঠা, দুশ্চিন্তা তাঁদের ছুঁতে পারে না। ঘুম মাঝে মধ্যে রাত পেরিয়ে, সকাল পেরিয়ে দুপুরেও চলে যায়। জিজ্ঞেম করলে বলেন, আমি থাকলে না কী তাঁদের টেনশন থাকে না। তাই ভাল ঘুম হয়।

সুন্দরবনে চলাফেরা করার জন্য নৌপথই একমাত্র পথ। ট্রলারে ঘুমের অভ্যাস করতে না পারলে তাই সেখানে নিজেকে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। প্রচন্ড কষ্টের মাঝেও ভালো লাগার অনেক অনুসঙ্গ থাকে সেখানে। তাই কষ্ট যতোই হোক, ঘুরেফিরে আবার চলে যাই সুন্দরবন। এই যেমন আবারও যেতে ইচ্ছা করছে এখন….
চলবে….

Please follow and like us:
0
Comments (0)
Add Comment