বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৬:৪৭ পূর্বাহ্ন

News Headline :
উন্নয়ন ও শান্তিতে থাকতে লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহবান জানালেন সাবেক এমপি আশু তালায় বিশ্ব জলাভূমি দিবস পালিত জনগণ সুযোগ দিলে দুর্নীতি নির্মূলে সর্বাত্মক চেষ্টা করবো: এমপি প্রার্থী রবিউল বাশার শ্যামনগরে সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শ্যামনগরে সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শিশু ও যুবদের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত পত্রদূতের উপদেষ্টা সম্পাদকের সুস্থ্যতা কামনায় তালা রিপোর্টার্স ক্লাব দলিতের উদ্যোগে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বোর্ড ফি বিতরণ সাতক্ষীরার শ্যামনগরে “ ব্লু কার্বন” প্রকল্পের লার্নিং ও সভা সুন্দরবনে মৎসজীবিদের জন্য টেকসই মৎসসম্পদ এবং জলবায়ু পরিবর্তনে ব্লু কার্বন প্রতিবেশ বিষয়ে শেয়ারিং সভা

সাতক্ষীরায় দলিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অধিকারে জোরদারের আহ্বান জলবায়ু পরিবর্তন, বৈষম্য ও বাস্তুচ্যুতির সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে নারীরা

নিজস্ব প্রতিনিধি:
“জন্মের পর থেকেই আমরা যেন প্রমাণ দিতে ব্যস্ত, আমরাও মানুষ।” চোখের কোণে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন আশাশুনি উপজেলার শোভনালী গ্রামের দলিত নারী কল্পনা রায়। সামাজিক অবহেলা, বৈষম্য আর বঞ্চনার যন্ত্রণা তাঁর কণ্ঠে যেন ইতিহাস হয়ে ধরা দেয়। তিনি বলেন, “স্কুলে ভর্তি হতে পারিনি, পুকুরের পানি নিতে গেলে বকা খেয়েছি, এমনকি চিকিৎসা নিতে গেলেও আলাদা লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। আজও আমরা এই সমাজে অতিথির মতোই আছি।”

বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর), বেলা ১১টায় সাতক্ষীরার বিনেরপোতা এলাকার ঋশিল্পী প্রশিক্ষণ হলরুমে অনুষ্ঠিত  ‘দলিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সামাজিক বঞ্চনা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা’ শীর্ষক জেলা অ্যাডভোকেসি সভায় কথাগুলো বলেন, কল্পনা রায়।
অ্যাডভোকেসি সভার আয়োজক উদ্দীপ্ত মহিলা উন্নয়ন সংস্থা এবং সহযোগিতায় অংশ নেয় আশার প্রদীপ সমাজ উন্নয়ন সংস্থা, প্রতিভা সংস্থা, নাগরিক উদ্যোগ ও খ্রিস্টান এইড।

সভায় উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রায় ৬৫ লাখ দলিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মানুষ এখনও সামাজিক বৈষম্য, বঞ্চনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সেবা থেকে দূরে অবস্থান করছেন। সাতক্ষীরার উপকূলীয় আশাশুনি, পাইকগাছা ও দাকোপ এলাকায় বাস করেন প্রায় ২ লাখ দলিত জনগোষ্ঠী। তাদের অধিকাংশই নিম্নমানের বাসস্থান, লবণাক্ত পরিবেশ, নিরাপদ পানির অভাব ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জীবনযাপন করছেন।

গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা গত তিন দশকে ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতিবছর ৬ থেকে ৮ মিলিমিটার হারে বাড়ছে, যা বিশ্ব গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। এ পরিস্থিতিতে কৃষি, পশুপালন, জীবনধারণের পানি, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা সবই হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে দলিত নারীরা, যাদের জীবন ঝুঁকি, বৈষম্য, সহিংসতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিচয় বৈষম্যের জটিল বাস্তবতায় নিমজ্জিত।

সভায় উঠে আসে, সাতক্ষীরার নদীবেষ্টিত অঞ্চলে এখনো অনেক পরিবার স্যানিটেশন সুবিধা, নিরাপদ প্রসবসেবা, হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা বা আইনগত সুরক্ষার সুযোগ পায় না। লবণাক্ত পানিতে ব্যবহারের ফলে মাসিকজনিত সংক্রমণ, ত্বকের রোগ ও প্রজনন স্বাস্থ্য জটিলতা ব্যাপকভাবে দেখা দিচ্ছে।

সভার প্রধান অতিথি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) শেখ মইনুল ইসলাম বলেন, “উন্নয়ন শুধু সড়ক বা সেতু নির্মাণ নয়। যারা সারাজীবন মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, তাদের অন্তর্ভুক্তি ছাড়া কোন উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না।”

সভাপতি ও মানবাধিকারকর্মী আশেক এলাহী বলেন, “যে মানুষ মৃত্যুর পর কবরের জায়গা পায় না, যার সন্তানকে আলাদা থালায় খেতে হয়, যে মেয়ের বিয়ে হয় না শুধু পরিচয়ের কারণে, তাদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।”

সভায় জানানো হয়, কম্পোজিট ভলনারেবিলিটি ইনডেক্স অনুযায়ী দলিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি স্কোর ০.৮ এর বেশি, যা ‘উচ্চ ঝুঁকি’ হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ, তারা শুধু দরিদ্র নন, বরং সামাজিকভাবে সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত।

নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, “জলবায়ুর ক্ষতি শুধু জমি বা ঘর ভাসিয়ে দেয় না, এটি মানুষের পরিচয়, মর্যাদা ও সামাজিক স্থানও কেড়ে নেয়।”

সাতক্ষীরা মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জোৎস্না দত্ত বলেন, “কেবল মানবিকতার দোহাই দিয়ে নয়, দলিত জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে আইনি সুরক্ষা, উন্নয়ন পরিকল্পনায় সংরক্ষিত বরাদ্দ, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।”

সভায় দাবি ওঠে, দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা জাতীয় ডাটাবেইস তৈরি, ভূমি মালিকানা সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুপেয় পানির নিশ্চয়তা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি এবং স্থানীয় ও জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্পে সরাসরি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার।

সভায় সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, এনজিও প্রতিনিধি, মানবাধিকার কর্মী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিসহ শতাধিক অংশগ্রহণকারী উপস্থিত ছিলেন।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Hostitbd.Com
Design & Developed BY Hostitbd.Com